অধ্যায় ১ – ছায়ার মতো কেউ (বর্ধিত সংস্করণ)
রাত তখন প্রায় দশটা। বাইরে গঙ্গার পাড়ে হালকা কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। জানালার কাচে ভেসে আসছে হাওয়ার ঠাণ্ডা ছোঁয়া, আর দূরের কোনো বাঁশির মৃদু সুর যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তৈরি করছে।
কলকাতার শহরতলিতে এক পুরনো দোতলা বাড়ির ভেতরে বসে আছে অনন্যা চক্রবর্তী— ইংরেজি অনার্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তার ঘরে চারপাশে বইয়ের স্তূপ, পুরনো কাগজপত্র, আর দেয়ালে রঙচটা একটা নোটিসবোর্ড— যেটা সে নিজেই নাম দিয়েছে “Unknown Mysteries”।
আজ সারাদিন ধরে তার মাথায় ঘুরছে একটা ঘটনা। সকালবেলায় কলেজের লাইব্রেরিতে এমন কিছু ঘটেছিল যা সে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মানতে পারছে না।
সকাল ১০টা।
কলেজের লাইব্রেরিতে ঢুকেই সে চেয়েছিল একটা পুরনো সাহিত্য ক্লাসিক পড়তে— “Wuthering Heights”। লাইব্রেরির পুরনো সংগ্রহ থেকে বইটা বের করল সে।
বইটা এমনভাবে গন্ধ ছড়াচ্ছিল, যেন কাগজগুলো নিজেই তার বয়স ঘোষণা করছে।
বইটা খুলতেই, প্রথম পাতার ভাঁজ থেকে খসে পড়ল একটা হলদেটে কাগজ।
একটু ভয় পেয়েই কাগজটা তুলল অনন্যা।
হাতে তুলে পড়তে পড়তে তার মুখের ভঙ্গি বদলে গেল—
“তুমি যদি কখনো এই চিঠিটা পাও, বুঝে নিও… আমার অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি।
তুমি এসেছিলে, কিন্তু আমি রয়ে গেছি…
– অ”
“অ” কে? কীসের অপেক্ষা?
চিঠির শেষে একটা নম্বর লেখা ছিল, কিন্তু সেটা ৭ সংখ্যার— আধুনিক মোবাইল নম্বর নয়।
অনন্যা খেয়াল করল কালি অনেকটাই মুছে গেছে, কিন্তু লেখা গুলোয় এক অদ্ভুত তীব্র আবেগ ফুটে উঠেছে।
হঠাৎ লাইব্রেরির কোণের দিক থেকে একটা মৃদু শব্দ শোনা গেল—
ঠক… ঠক… ঠক…
সেই পুরনো কাঠের তলার আওয়াজ, যেটা কারো পায়ের ধাক্কায় হয়।
সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল।
কেউ নেই।
কিন্তু তার ঠিক পাশের র্যাকে রাখা একটা বই হঠাৎ নিচে পড়ে গেল।
তাড়াতাড়ি লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে আসে অনন্যা।
সারাদিন সে চুপ করে ছিল, কাউকে কিছু বলেনি। রাতে তার পড়ার টেবিলের আলোটা ছাড়া ঘরটা অন্ধকার। কিন্তু জানালার ওপাশে বারবার মনে হচ্ছিল কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ, মোবাইলটা ভাইব্রেট করতে লাগল।
একটা মেসেজ এল—
“তুমি চিঠিটা পেয়েছ। কিন্তু তুমি কি তার জন্য প্রস্তুত?”
অনন্যা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল। নম্বরটা আবার সেই অচেনা ধরণের, সব শূন্যে ভর্তি—
0000000000
এই প্রথম সে সত্যি সত্যি ভয় পেল।
ফোনটা বেজে উঠল।
ধরা মাত্রই ওপাশে কেউ কিছু বলল না।
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। ধীরে ধীরে যেন তা গা ছমছমে হয়ে উঠল।
তারপর সেই কণ্ঠস্বর—
“তুমি ওর চিঠি পড়েছো… এবার ওর গল্পও শুনবে?”
ধপ করে ফোন কেটে গেল।
পরদিন সকালে কলেজে গিয়ে লাইব্রেরিয়ান মিসেস ধর-কে জিজ্ঞেস করল অনন্যা—
“ম্যাডাম, কাল আমি যে Wuthering Heights বইটা পড়ছিলাম, সেটা কে দান করেছে?”
মিসেস ধর একটু চিন্তা করে বললেন—
“সেইটা তো অনেক পুরনো… মনে হয় ৯০’র দশকে কোনো প্রাক্তন ছাত্র দিয়ে গেছিল। নামটা… হ্যাঁ, মনে পড়ছে— অর্ণব ঘোষ।
অদ্ভুত ছেলেটা ছিল। খুব শান্ত, খুব মেধাবী। কিন্তু একদিন কলেজেই না এসে… গায়েব হয়ে গেল।
নিখোঁজ হয়ে যায়। পুলিশে রিপোর্ট হয়েছিল, কিন্তু আর কোনও খোঁজ মেলেনি।
তারপর অনেক বছর পর কেউ কলেজে কিছু বই পাঠিয়ে দেয়— হয়তো তারই পরিবার। কিন্তু আজও আমরা ঠিক বুঝতে পারিনি ওর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার পেছনে আসল কারণ।”
অনন্যার বুকের ভিতরে কাঁপুনি ধরল।
“অর্ণব”… মানে সেই “অ”?
তবে কি সে এই চিঠিগুলোর লেখক?
সেই রাতেই অনন্যার ফোনে আবার একটা মেসেজ এল—
“তুমি যদি সত্যি জানতে চাও… কাল সন্ধ্যা ৬টায় কলেজের লাইব্রেরির পেছনের গেটের কাছে এসো।
একাই এসো। কাউকে বলো না।”
সেই মুহূর্তে অনন্যার মনে হল—
কোনো কিছু তাকে টানছে। কোনো হারিয়ে যাওয়া অতীত…
নাকি এক অসমাপ্ত প্রেমের অদৃশ্য ছায়া?

Leave a Reply