গুগল ম্যাপে রহস্য(একটি বাংলা রহস্যগল্প)

তন্ময়ের অফিস থেকে ফেরার পথে আজ একটু দেরি হয়ে গেল। গলির মোড়ে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে সে হঠাৎ গুগল ম্যাপে নিজের বাড়ির লোকেশন দেখতে লাগল। সবে কয়েকদিন আগে অফিসের এক কলিগ তাকে দেখিয়েছিল কীভাবে স্যাটেলাইট ভিউ দিয়ে নিজের বাড়ি দেখা যায়। কৌতূহলবশত সে বাড়ির লোকেশন খুলে জুম করতে লাগল।

গুগল ম্যাপের ছবিটা কিছুটা পুরনো। বাড়ির ছাদে তখন পুরনো সব কাপড় শুকোচ্ছে আর পেছনের বাগানে ছায়া পড়েছে একটা গাছের। কিন্তু তার চোখ আটকে গেল বাড়ির ঠিক পেছনের এক কোণে। সেখানেই একটা লম্বা কালচে ছায়া পড়ে আছে মাটিতে — কিছুটা মানুষের মতো।

প্রথমে তন্ময় ভেবেছিল, হয়তো কোন গাছের বা ঝোপের ছায়া। কিন্তু সে আরও জুম করতেই ছবিটা স্পষ্ট হতে শুরু করল। ছায়াটা যেন কারো পড়ন্ত শরীর। দুটো হাত ছড়িয়ে, একটা পা কিছুটা বাঁকা হয়ে আছে। পাশে কিছু একটা ছড়ানো—মাঝে একটা লালচে দাগ।

তন্ময়ের গলা শুকিয়ে এল।

এই বাগান তো তাদের বাড়ির! অথচ সে তো কখনো এমন কিছু দেখেনি! সেটা আবার নিজের চোখে দেখতেই বাড়ি ঢুকেই সে ছুটে গেল পেছনের বাগানে। সন্ধ্যা নেমেছে। আলো আঁধারি ছায়া। ঘাস গুলো কেটে রাখা, গাছগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে। কিন্তু ঠিক যেখানে গুগল ম্যাপে ছায়াটা ছিল, সেখানে এখন কিছুই নেই।

“কি করিস?”— পেছন থেকে ডাকল মা।

“এই… এমনি, ওই বাগানের দিকে দেখছিলাম,”— অস্পষ্টভাবে বলল তন্ময়। মা চলে গেলে সে আবার ফোন বের করে গুগল ম্যাপ খুলল। ঠিক সেই ছায়া। এইবার সে ছবিটা স্ক্রিনশট নিয়ে রাখল।

রাতে খেতে বসে বাবা বললেন, “তোর জেঠুর বাগানে নাকি কয়েকদিন আগে কিছু খোঁজাখুঁজি হচ্ছিল… পুলিশ এসেছিল।”

“কেন?”— তন্ময় চমকে উঠল।

“কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না, বলছিল নাকি ওইদিকের কোন জায়গায় গুম হয়েছে।”

তন্ময়ের হাত থেকে চামচ পড়ে গেল।

সেই রাতেই সে আবার গুগল ম্যাপ ঘেঁটে দেখতে লাগল আশেপাশের এলাকা। আচমকাই সে দেখল — একই দিনে তোলা অন্য একটি ছবি (Street View)। সেখানে সেই একই ছায়া, কিন্তু অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে। এবং এবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে — সেই ছায়ার মুখটা কিছুটা পাশ ফিরে। অদ্ভুতভাবে ফ্যাকাশে… যেন বাঁচার আকুতি।

তন্ময় এখন আর বুঝতে পারছে না সে কি দেখছে — বাস্তব, না কল্পনা।

পরদিন সকালে সে যায় থানায়। অফিসাররা প্রথমে গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু ছবিগুলো দেখার পর তারা নড়েচড়ে বসে। একজন অফিসার বলেন, “এই জায়গাটা তো আমাদের রেকর্ডে আছে। এক যুবক নিখোঁজ হয় কয়েক মাস আগে, বাড়ির পেছন থেকে শেষ লোকেশন পিং হয়েছিল। কিন্তু কখনো প্রমাণ মেলেনি।”

গুগল ম্যাপের সেই স্ক্রিনশট অফিসাররা নেন এবং সেই অনুযায়ী খোঁজ শুরু হয়। পুলিশের দল এসে বাড়ির পেছনের বাগানে খনন চালায়।

সন্ধ্যার ঠিক আগে কিছু একটা পাওয়া যায়। মাটির নীচে চাপা পড়ে ছিল মানুষের একটি কঙ্কাল, পাশে একটি মোবাইল ফোন — সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবস্থায়।

ডিএনএ টেস্টে নিশ্চিত হওয়া যায় — এটাই সেই নিখোঁজ যুবক, সঞ্জয় সরকার।

ঘটনার চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়ায়। তন্ময়ের সাহস ও গুগল ম্যাপের তথ্য দিয়েই হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়।

কিন্তু তন্ময় এরপরও রাতে ঘুমাতে পারে না। কারণ, তার মনে হয়— গুগল ম্যাপ এখনও মাঝে মাঝে সেই ছায়াটাকে দেখায়… আর প্রতিবারই সেই ছায়াটা তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *